ভয়েস এশিয়ান, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তার বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসরে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি সামনে আনছে নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি। এআই ব্যবহার করে ডিপফেক ভিডিও ও ছবি তৈরি, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, অনলাইন হয়রানি, প্রতারণা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করেও এআইনির্ভর অপতৎপরতার অভিযোগ সামনে আসছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং পুলিশের বিভিন্ন রেঞ্জ সদর দপ্তরে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট ও গবেষণাগার স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর ভাষ্য, ডিজিটাল ও সাইবার অপরাধ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে; ফলে অপরাধ শনাক্তকরণ ও তদন্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে আইনগত কাঠামোও শক্তিশালী করার উদ্যোগ চলছে। সরকারের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কনটেন্ট সামাজিক সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাইবার অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনৈতিক অপতথ্যের নতুন হাতিয়ার এআই
বাংলাদেশে এআইয়ের অপব্যবহারের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি রাজনৈতিক অপতথ্য। আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও, সংবাদ ও মতামত ছড়িয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে-বিদেশে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত তৈরির উদ্দেশ্যে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট প্রচার করছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে একাধিক সংগঠিত অনলাইন গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার কথাও জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, এসব গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও শিল্পীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।
তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এআইনির্ভর রাজনৈতিক অপপ্রচারের বিষয়টি একই সঙ্গে প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
ডিপফেক থেকে ব্যক্তিগত হয়রানি
এআইয়ের অপব্যবহার শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের ছবি ও কণ্ঠ ব্যবহার করে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি, পরিচয় জালিয়াতি, ব্ল্যাকমেইল, অনলাইন হয়রানি এবং প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশেষ করে ডিপফেক প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় একজন ব্যক্তির মুখ বা কণ্ঠ ব্যবহার করে এমন ছবি, ভিডিও কিংবা অডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা বাস্তব বলে মনে হতে পারে। ফলে কোনো কনটেন্ট সত্য নাকি কৃত্রিমভাবে তৈরি—তা শনাক্ত করা সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করে এ ধরনের প্রযুক্তির অপব্যবহার আরও গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে। ভুয়া পরিচয়, হয়রানি ও ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অপরাধে এআই ব্যবহারের আশঙ্কাও রয়েছে।
সাইবার অপরাধের ধরন বদলে যাচ্ছে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অপরাধের উল্লেখযোগ্য অংশ এখন সাইবার পরিসরে সংঘটিত হচ্ছে এবং বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। অনলাইন জালিয়াতি, ব্ল্যাকমেইল, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, পরিচয় জালিয়াতি এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আধুনিক আইন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেছেন।
এ বাস্তবতায় শুধু আইন করলেই হবে না, অপরাধ শনাক্ত করার প্রযুক্তিও উন্নত করতে হবে। ডিজিটাল ফরেনসিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কনটেন্ট শনাক্তকরণ, তথ্য যাচাই এবং অনলাইন অপরাধের উৎস শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানো এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম অপতথ্য
এআই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—অপতথ্য ও ক্ষতিকর কনটেন্ট ঠেকাতে গিয়ে যেন বৈধ মতপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অশ্লীলতা ছড়ানো কিংবা নারী, শিশু ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনলাইনে হয়রানি কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
একই সঙ্গে তিনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকের সাইবার অধিকার রক্ষার বিষয়টি স্পষ্ট রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতারও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বাইরে উদ্বেগ আরও বড়
বাংলাদেশে এআইয়ের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি মূলত অপতথ্য, প্রতারণা, ডিপফেক ও সাইবার অপরাধ ঘিরে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে আলোচনার পরিধি আরও বিস্তৃত।
এআই এখন লেখা, ছবি ও ভিডিও তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার নির্মাণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মানুষের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিটি যত শক্তিশালী হচ্ছে, ভবিষ্যতে এর ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর থাকবে—সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
Anthropic, Google DeepMind এবং OpenAI-এর মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষক ও কর্মকর্তারা এআই নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতার কথা বলেছেন। অত্যন্ত সক্ষম এআই ভবিষ্যতে সাইবার অপরাধ, প্রতারণা, প্রভাব বিস্তার কিংবা অন্যান্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন আশঙ্কা নিয়ে গবেষণাও চলছে।
কেউ কেউ আরও চরম পরিস্থিতির কথা বলছেন, যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে এআই আগামী এক দশকের মধ্যে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করবে—এমন নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণীর পক্ষে বর্তমানে সর্বসম্মত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে পার্থক্য করাও তাই জরুরি।
বাংলাদেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হতে পারে এআইয়ের ব্যবহারকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল কাঠামোর মধ্যে আনা। কেবল অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, আগেই ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত করার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন—
এআইনির্ভর ডিপফেক শনাক্ত করার প্রযুক্তি, ডিজিটাল ফরেনসিকস সক্ষমতা বাড়ানো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, শিশু ও নারীর অনলাইন নিরাপত্তা জোরদার, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ানো, এআই ব্যবহারে নাগরিকের গোপনীয়তা ও অধিকার রক্ষা, এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা।
প্রযুক্তির শক্তি, নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব মানুষের
এআই বাংলাদেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা তৈরি করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, প্রশাসন ও গবেষণায় এর ব্যবহার দেশের কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত বা অপরাধমূলক ব্যবহার তৈরি করতে পারে নতুন ধরনের সামাজিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি।
তাই বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ এআইকে থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং এর সুফল কাজে লাগিয়ে অপব্যবহারের ঝুঁকি কমানো। প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোবে, নিরাপত্তা কাঠামোকেও তত দ্রুত এগোতে হবে।
এআই বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু প্রযুক্তি কতটা শক্তিশালী হলো তার ওপর নয়, বরং রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ সেই শক্তিকে কতটা স্বচ্ছ, নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করতে পারল তার ওপর।