ভয়েস এশিয়ান, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করার পর ১ লাখেরও বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দেশের ভেতরেই বিপুলসংখ্যক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। একই সাথে নিরাপত্তার খোঁজে সমুদ্রের বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে হাজার হাজার মানুষ বাব আল-মানদেব প্রণালী পার হয়ে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, সংঘাতের এই দ্রুত বিস্তার একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। কারণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সীমিত সম্পদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। ইয়েমেনের ভেতরে গৃহহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলোর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে প্রাথমিকভাবে অন্তত ১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের অতিরিক্ত তহবিলের আকুতি জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া জিবুতিতে পৌঁছানো শরণার্থীদের জন্য বাড়তি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।
ইউএনএইচসিআর-এর বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “অনেক পরিবারকে খুব কম সময়েই পরনের অল্প কিছু জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছে। বর্তমানে আশ্রয়স্থল, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ইতিমধ্যেই স্থান সংকট দেখা দিয়েছে।”
সংঘর্ষের কারণে কেবল স্থানীয়রাই নন, বরং ইয়েমেনে অবস্থানরত প্রধানত সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ার প্রায় ৬৫,০০০ নিবন্ধিত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং বাব আল-মানদেব প্রণালীতে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দ্রুত সামরিক অবস্থান জোরদার করলে মূলত এই বাস্তুচ্যুতির ঘটনা শুরু হয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালীটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট।
সংঘাতের ভয়াবহতার বিবরণ দিয়ে মোখা বন্দরের কাছের একটি গ্রামের বাসিন্দা আয়েশা মুহাম্মদ জানান, গত সপ্তাহে হুতিরা গ্রাম দখল করে নিলে তিনি বাধ্য হয়ে নিজের পাঁচ সন্তানকে সেখানে রেখেই পালিয়ে আসেন। তিনি বলেন, “তারা সেখানে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে এবং চারদিক থেকে গোলাগুলি চলছে। শুধু চাল ফুটিয়ে খাচ্ছে, কোনো রুটি বা অন্য খাবার নেই। আমার মেয়েরা ফোন করে কেঁদে কেঁদে বলছিল যে তারা আমাদের কাছে চলে আসতে চায়, কিন্তু পুরো পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর বের হওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”
হোদেয়দাহ থেকে পালিয়ে আসা আরেক বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি হুসেন হায়দারা বলেন, “পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে বাচ্চাদের নিয়ে জীবন বাঁচিয়ে বের হওয়াই কঠিন ছিল। চারপাশের তীব্র বোমাবর্ষণ আর স্নাইপারদের আক্রমণের ভয়ে পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছু নেওয়ার সুযোগই পাইনি। আমরা শিশুদের সুরক্ষার কথা ভেবে যত দ্রুত সম্ভব ছুটে পালিয়ে এসেছি।”
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, গত চার দিনে ২,৪০০-এরও বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ অতিক্রম করে জিবুতিতে পৌঁছেছেন, যাদের বড় অংশই নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধ।
জিবুতিতে নিযুক্ত ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিনিধি স্যান্ডরিন দেসামোর্স বলেন, “সমুদ্রের ভয়ংকর পথ পেরিয়ে চরম শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় মানুষ এখানে পৌঁছাচ্ছেন। তাদের সাথে প্রয়োজনীয় কোনো সম্পদ বা জিনিসপত্র নেই।”