ভয়েস এশিয়ান, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয়সীমা এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীর জন্য নির্বাচনী হলফনামা দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম হলে ফল স্থগিত বা নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোট নেওয়ার ক্ষমতাও পেয়েছে কমিশন।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের স্বাক্ষর করা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনী প্রজ্ঞাপন বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশ করা হয়। এতে ইউপি নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বাড়ল জামানত
নতুন বিধান অনুযায়ী, চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীর জামানত ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। জামানত ট্রেজারি চালান, পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুকূলে জমা দিতে হবে। একই প্রার্থীর পক্ষে একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল করা হলেও একাধিক জামানত দিতে হবে না।
জামানত ফেরতের শর্তও পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন কোনো প্রার্থী প্রদত্ত মোট ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ না পেলে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। আগে এ ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত করার বিধান ছিল। জামানত ফেরত পাওয়ার যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের ফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের ছয় মাসের মধ্যে অর্থ গ্রহণ না করলে তা সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
বাড়ল নির্বাচনী ব্যয়সীমা
সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয়সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। সদস্য প্রার্থীর ব্যয়সীমা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। চেয়ারম্যান প্রার্থীকে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব পরিচালনার জন্য তফসিলি ব্যাংকে আলাদা হিসাব খুলতে হবে এবং সব নির্বাচনী ব্যয় ওই হিসাবের মাধ্যমে করতে হবে। কোনো খাতে ২০ হাজার টাকা বা তার বেশি ব্যয় হলে তা চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।
প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে ইসি
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। কোনো উৎস থেকে পাওয়া রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনী এজেন্টের বিরুদ্ধে বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশন তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে লিখিত আদেশে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে কমিশন। এ আদেশ প্রার্থী, তাঁর নির্বাচনী এজেন্ট ও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে এবং সরকারি গেজেটে প্রকাশ করতে হবে।
কোনো ভোটকেন্দ্রের ফলাফল বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি, কারসাজি বা অন্য কোনো অপকর্মের কারণে চরমভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হলে ওই কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করতে পারবে ইসি। পরে অনুসন্ধানে প্রয়োজন মনে করলে কেন্দ্রটির নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোটগ্রহণের নির্দেশও দিতে পারবে।
চেয়ারম্যান প্রার্থীর হলফনামা বাধ্যতামূলক
এবার ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নির্বাচনী হলফনামা দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আগের বিধিমালায় এ ধরনের বাধ্যবাধকতা ছিল না। তবে সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীদের জন্য হলফনামা দেওয়ার বিধান রাখা হয়নি।
লটারির বদলে পুনঃভোট
দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে এবার লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করা হবে না। সমান সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে পুনরায় ভোট নেওয়ার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেবে নির্বাচন কমিশন।
এ ছাড়া দৃষ্টি বা শারীরিক প্রতিবন্ধিতা কিংবা অন্য কোনো কারণে সহায়তা প্রয়োজন এমন ভোটারকে ভোটদানে সহায়তার জন্য কমপক্ষে ২১ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সহায়তাকারী কোনো প্রার্থী, প্রার্থীর এজেন্ট, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হতে পারবেন না।
গণমাধ্যমকর্মীকে বাধা দিলেও শাস্তি
নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, কমিশন অনুমোদিত গণমাধ্যমকর্মী বা পর্যবেক্ষককে হুমকি, ভয়ভীতি, আঘাত বা বলপ্রয়োগ করে বাধা দেওয়া কিংবা তাঁদের সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একইভাবে ভোটারকে কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, কোনো প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র দাখিল থেকে বিরত রাখা বা মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করাও অপরাধ। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘন মনিটরিংয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক মনিটরিং কমিটি গঠন করতে পারবে কমিশন।
নির্দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন
আগামীতে স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ের নির্বাচন হবে নির্দলীয় প্রতীকে। নির্বাচনে ইউপি চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত সাধারণ সদস্য ও সাধারণ সদস্য আসনের জন্য প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইউপি নির্বাচন বিধিমালা (সংশোধনী) প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী চেয়ারম্যানের জন্য ২০টি, সংরক্ষিত আসনে ১০টি এবং সাধারণ সদস্য প্রার্থীর ১২টি প্রতীক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনটি ১৭ সেপ্টেম্বর জারি করা হলেও আজ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এটি প্রকাশিত হয়।
চেয়ারম্যানের পদে এবার যেসব প্রতীক থাকবে সেগুলো হলো, কম্পিউটার, কলার ছড়ি, ঘণ্টা, ঘোড়া, চিংড়ি, জগ, টেবিলঘড়ি, টেলিফোন, দালান, দোতলা বাস, পাগড়ি, বেবিট্যাক্স, ময়ূর, মোবাইল ফোন, মোটর সাইকেল, মোড়া, রেল ইঞ্জিন, সোফা ও হাঁস।
সংরক্ষিত আসনের সদস্য পদের জন্য সংরক্ষিত প্রতীকগুলো হলো, আলমারি, কলস, ড্রেসিং টেবিল, পালকি, ফলের ঝুড়ি, মাইক, সেলাই মেশিন, সূর্যমুখী ফুল, হরিণ ও হেলিকপ্টার।
সাধারণ সদস্য পদের সংরক্ষিত প্রতীকগুলো হলো, উট, কাপ-পিরিচ, ঘুড়ি, জাহাজ, টর্চলাইট, টিউবওয়েল, ট্রাক্টর, তালা, ফুটবল, বৈদ্যুতিক পাখা, বৈদ্যুতিক বাল্ব ও মোরগ।